দরজায় ঠক..ঠক.. ব্যাগভর্তি খাম নিয়ে এই ভরদুপুরে পোস্টমাস্টার এসেছে।
“সুব্র, কি ব্যাপার?” “কেমন আছেন, ডাকবাবু? আজকে আমার ঠিকানায়?” “সেই গতবছর, এই মাসেই বোধহয় এসেছিলাম তোমার গোলাপী খাম নিয়ে, মনে আছে তো?” “হ্যাঁ, খুউব, এরপর তো আর আসেন নি” “তোমার জন্যে কোনো চিঠি যে এতদিন আসেনি বাবা, আমি কি করে আসি?” উদগ্রীব হয়ে শুধালাম, “আজ এসেছে?”
উনি মাথা নিচু করে ব্যাগ থেকে অনেক খাম বের করলেন। অদ্ভুত, আমার পাঠানো খামের মতনই সব! দারুণ তো, তুমিও না শ্রী, পারো বটে! একই দেখতে খাম জোগাড় করে এতদিনের সব চিঠি একবারে পাঠালে?
“আসে নি..” “আসে নি? তাহলে এত খাম?” “ওহ, এগুলো? সব চিঠির প্রেরকে তো তোমার নাম লেখা, সুব্র!”
“মানে?” আমার দিকে হাত বাড়িয়ে, “এই যে দেখো..”
আমি তো ঠিকানা কখনোই ভুল করিনি, আশ্চর্য! “আমিও একটু অবাক-ই হয়েছি, সুব্র!” “কিন্তু আমি তো ঠিক ঠিকা..” “খামের গায়ে কিছু লেখা আছে, বাবা?”
শ্রী, তোমার নামের উপরে বড় লাল সিল, “অদাবিষ্কৃত!” “অদাবিষ্কৃত?” “প্রাপক নেয় নি!” “নেয় নি? এটা কিভাবে সম্ভব?” “জানি না, বাবা.. আজ আসি, বড্ড শুকিয়ে গেছো..” “কিন্তু, ডাকবাবু?” “আসছি, বাবা.. নিজের যত্ন নিও!”
পেছনে না তাকিয়েই ডাকবাবু চলে গেলেন। আমার হাতে তোমার নামের সব খাম। আমি কাকে লিখলাম এতদিন?
“চিঠির খামে ধুলো জমেছে, স্মৃতিদের আজ স্তূপ, ডাকপিয়ন তোমার কাছে গেলেও তুমি ছিলে চুপ!”
অদাবিষ্কৃত? অদাবিষ্কৃত মানে কি, শ্রী? প্রাপক সত্যি নেয়নি, নাকি প্রাপক নামের মানুষটাই আর ওই ঠিকানায় থাকে না?
হাতে থাকা নীল-গোলাপী খামগুলোর দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলাম। তীব্র শূন্যতা নিয়ে খামগুলো ড্রয়ারে তুলে রাখতে যাবো, হঠাৎ সবচেয়ে নিচের খামটার দিকে নজর আটকে গেলো। লাল সিলের ঠিক নিচেই, খুব আবছা করে লেখা একটা তারিখ।
“২০শে অগ্রহায়ণ”
বুকের ভেতরটা হিম হয়ে গেল। 'অদাবিষ্কৃত' সিল মারা হয়েছে এত পরের তারিখে, অথচ ডাকবাবু আজ ভরদুপুরে নিয়ে এলেন?
খেয়াল করলাম, এই নির্দিষ্ট খামটার মুখ আঠা দিয়ে পুরোপুরি বন্ধ করা নেই, আলগা হয়ে আছে। কাঁপাকাঁপা হাতে খামটা খুলতেই আমার নীল রঙের প্যাডের কাগজটা বেরিয়ে এলো। কিন্তু ভাঁজ খুলতেই আমার চোখের দৃষ্টি থমকে গেলো। ভেতরে আমার চিঠির কোনো অস্তিত্ব নেই! আমার লেখার ওপর দিয়ে কে যেন সযতনে সাদা কালি বুলিয়ে দিয়েছে। আর সেই সাদা ক্যানভাসের ঠিক মাঝখানে তোমার সেই চেনা হাতের লেখায় জ্বলজ্বল করছে শুধু একটা লাইন,
"রেললাইনের জল নেমে গেছে সুব্র, আমি নিজেই এসেছি। কিন্তু তুমি যে ঠিকানায় চিঠি পাঠাচ্ছো, সেখানে 'শ্রী' নামের কেউ আর থাকে না। যদি ওই তারিখের কনককঙ্কন ধরো, দেখতে পাবে প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে আছে এক..."
চিঠির ঠিক এই জায়গাটাতেই বাকি অংশটুকু অদ্ভুতভাবে ছিঁড়ে নেওয়া!
কে ছিঁড়লো? ডাকবাবু? নাকি তুমি ইচ্ছে করেই অসম্পূর্ণ রাখলে? 'শ্রী' যদি না থাকে, তবে কনককঙ্কন ট্রেন থেকে নামলে প্ল্যাটফর্মে আমি কাকে দেখতে পাবো? আর এত পরের চিঠি আজ আমার হাতে কীভাবে এলো?