'তোর আসতে এতক্ষণ লাগলো?'
'ওই একটু জ্যামে আটকে ছিলাম। তোকে কতদিন পর দেখলাম।'
'আগে তুই বল, আমি না হয় হাসপাতালে ছিলাম, তোর মাথায় এই ব্যান্ডেজ কিসের?'
'ও কিছু নাহ্, একটু মাথায় লেগেছিল! বাদ দে, চল।'
' আচ্ছা চল।'
একটু এগোতেই রিকশা পেলাম। সামান্য যেতে না যেতেই, জ্যামের মুখে পড়তে হলো। ছোট্ট একটা মেয়ে ফুল বিক্রি করছে। আমাদের দেখে এদিকে দৌড়ে আসলো। আরে এটা তো আমাদের ফুলকন্যা। তুমি ওকে ফুলকন্যা বলে ডাকতে। আগে রোজ তুমি ওর কাছ থেকে ফুল নিতে, মনে আছে?
ও বলে উঠলো, 'ভাইয়া, বহুতদিন আফনারে দেহি নাই, আফনের কি অসুখ হইছিলো?'
'হ্যাঁ রে, ফুল। একটু অসুস্থ ছিলাম। তুমি ভালো আছো?'
'জ্বি ভাইয়া, আজকে আফার জন্যে ফুল নিবেন না?'
'অবশ্যই, তোমাকে পেয়েছি আর তোমার কাছ থেকে ফুল নিবো নাহ্?'
'ভাইয়া, এই লন। দুইটা লাল গোলাপ।'
ফুলগুলো নিয়ে ওর হাতে একশ টাকা দিতেই জ্যাম ছেড়ে দিয়েছে। ও জানে বাকি টাকা নিবো নাহ্। রিকশা এগোতে লাগলো, তবে ও দৌড়ে এগিয়ে আসছে। ওকে আসতে দেখে মামাকে বললাম একটু দাঁড়ানোর জন্যে। সে কিছুক্ষণ জিরিয়ে নিলো আর একটা গোলাপ বাড়িয়ে দিয়ে বললো,
'ভাইয়া, আফারে কইবেন এইটা আমি দিসি উনারে!'
ফুল কন্যা আসলেই মিষ্টি একটা মেয়ে। রিকশা এগোতে থাকলো, হুড খোলা আর আমার হাতে তোমার জন্যে ফুল। সৃজন কেমন জানি কথা বলছে নাহ্ আজ, অন্যদিন রিকশায় উঠলে আমরা দুনিয়ার গল্প জুড়ে বসি।
তোমার এলাকায় প্রবেশের আগে একদম শুনশান পরিবেশে একটা কবরস্থান আছে। এটা বোধহয় এই এলাকার নিশানাস্বরূপ। কবরস্থানের কথা বললেই চিনে সবাই, এইতো রিকশাওয়ালা মামাকেও একই নাম বলায় চিনেছে।
কবরস্থানের সামনে আসতেই সৃজন রিকশাওয়ালা মামাকে দাঁড়াতে বললো। ওর কি হলো হঠাৎ?
'কিরে দোস্ত? এখানে দাঁড়িয়েছি কেন?'
'আমার সাথে আয়!'
'তোকে বললাম ওর সাথে দেখা করা জরুরি! আর তুই এখানে নেমে যাচ্ছিস।'
'আরে আয়। কিছুদিন আগে আমার এক আত্মীয় ইন্তেকাল করেছেন, একটু জিয়ারত করে আসি।'
ওহ হ্যাঁ, মনে পড়েছে, এই এলাকায় সৃজনের এক আত্মীয়ের বাসা। আঙ্কেলের তো বয়সও হয় নি তেমন, উনি মারা গেলেন কিভাবে? হাজারটা প্রশ্ন ঘুরছে মাথায়, পরে জিজ্ঞাসা করবো, আগে জিয়ারত করে আসি।
'আচ্ছা, তুই এই কারণেই আজকে এত নিশ্চুপ? আমাকে আগে বললিও নাহ্!'
'মন আমারও ভালো নেই রে। পৃথিবী বড্ড নিষ্ঠুর!'
'মন খারাপ করিস নাহ, কেউই চিরজীবন এই ধরায় থাকে নাহ্!'
'তা ঠিক, তবে..'
আর কিছু বললো নাহ্ সে। ভারী অদ্ভুত। হাঁটতে হাঁটতে কবরস্থানের ভেতরে এসে পড়েছি। চোখে পড়লো নতুন একটা কবর। তিন-চার দিন আগের হবে হয়তো, উপরে লাগানো পাতাগুলো এখনো সতেজ! এপিটাফে দারুণ অক্ষরে তোমার নাম। আমি মাটিতে বসে পড়েছি। আমার পাশে সৃজন কাঁদছে।
'সেদিন হাসপাতাল থেকে ফেরার পথে আমাদের এক্সিডেন্ট হয়। জিজ্ঞাসা করছিলি নাহ্ এই ব্যান্ডেজ কিসের। এই ব্যান্ডেজ সেদিনের.. অনেক চেষ্টা করেছি সুব্র, ওকে আমরা বাঁচাতে পারি নি! এ্যাম্বুলেন্সে অবধি শুধু তোর নাম নিচ্ছিলো..'
আমার চোখ ভিজে গেছে, আর কিছুই শুনতে পাচ্ছি নাহ্ ওর কথা। মাটি ভিজে লাল হয়ে আছে, হাতে গোলাপের কাঁটা ফুটে রক্ত বেরিয়েছে বোধহয়।
'কি থেকে কি হয়ে গেলো, তোকে কিছু জানাইনি তোর অবস্থার জন্যে। ভাই, কিছু তো বল!'
এক পলক গোলাপ গুলোর দিকে তাকালাম, ওগুলো তোমার জন্যে আনা। তোমার উপরে ওদের রাখতেই আমার চোখ ঝাপসা হয়ে এসেছে। এরপর আর কিছুই জানি নাহ.. বোধহয় আবারও জ্ঞান হারিয়েছি।
একটা প্রশ্ন করি?
'আচ্ছা, স্বর্গেও কি বৃষ্টি হয়? আমিও ভিজতে চাই তোমার সনে!' বোধহয়, আগের একটা প্রশ্নও জমা হয়ে আছে..
'তোমার কি মন খারাপ?'